চেক ডিজঅনার কি এবং চেক ডিজঅনার হলে কিভাবে মামলা করবেন।

চেক ডিজঅনার কি এবং চেক ডিজঅনার হলে কিভাবে মামলা করবেন।

Table of Contents

বর্তমান সময়ে চেক ডিজঅনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন বিষয়। সাধারনত, আমরা প্রতিনিয়ত ব্যাংকিং কার্যক্রম ও লেনদেন করতে নির্ভরযোগ্য উপাদান হিসেবে চেক ব্যাবহার করে থাকি। বিশেষত, ব্যাবসায়িক লেনদেনে চেক একটি অপরিহার্য্য উপাদান। আবার, কোন লেনদেন ও পাওনা টাকার নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে ব্ল্যাংক চেক/ ফাকা চেক জিম্মা রাখার প্রবনতাও আমাদের সমাজে রয়েছে। এমনকি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকগুলোও তাদের গ্রাহকদের লোন দেওয়ার সময় জিম্মা হিসেবে খালি চেক জমা রেখে দেন। আর চেকের এই নানাবিধ ও ব্যাপক ব্যাবহারের কারনে উদ্ভব হয়েছে নানান জটিলতা ও অপরাধের। চেকের এইসব নানাবিধ সমস্যা ও সমাধান নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।

চেক ডিজঅনার কি?

সাধারনত কোন চেক নগদায়ন/ টাকা উত্তোলন/ নিজ একাউন্টে জমার জন্য ব্যাংকে জমা প্রদান করলে কোন সমস্যার কারনে যদি চেকটি নগদায়ন/ টাকা উত্তোলন/ নিজ একাউন্টে টাকা জমা করা না যায় তাহলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চেক জমাদানকারী ব্যক্তিকে চেকটি ফেরত প্রদান করেন ও একটি চেক ফেরত স্বারক (ডিজঅনার স্লিপ) প্রদান করেন। এই পদ্ধতিটিকেই চেক ডিজঅনার বলা হয়। উক্ত চেক ফেরত স্বারক বা ডিজঅনার স্লিপে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ডিজঅনারের তারিখ, চেকের নাম্বার, চেক ডিজঅনার হওয়ার কারন উল্ল্যেখ করে থাকেন।

চেক ডিজঅনারের উল্ল্যেখযোগ্য কারনসমূহঃ

১।      একাউন্টে চেকে উল্লেখিত পরিমান টাকা না থাকা।

২।     চেক প্রদানের তারিখ হতে ০৬ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলে।

৩।     চেকে প্রদানকৃত স্বাক্ষরের সাথে একাউন্ট হোল্ডারের স্বাক্ষরের গরমিল থাকলে।

৪।     একাউন্ট বন্ধ করে দিলে (ক্লোজড)/ ডরমেন্ট/ ব্লক থাকলে।

৫।     চেকে প্রদানকারী কর্তৃক চেক স্টপ করে রাখলে/ অভিযোগ দিয়ে রাখলে।

৬।    কর্পোরেট চেকে সিল না থাকলে।

৭।     চেকের টাকার পরিমান ও কথায় লিখার মধ্যে গরমিল থাকলে।

৮।     তারিখ বিহীন/ অসম্পূর্ন চেক উপস্থাপন করা হলে।

৯।     চেকে উল্লিখিত তারিখের পূর্বেই ব্যাংকে চেকটি উপস্থাপন করা হইলে।

১০।   তিন বারের বেশি চেক উপস্থাপন করা হইলে।

১১।    চেকের মধ্যে কোন পরিবর্তন বা পরিবর্তনের চেষ্টা করলে বা কোন ধরনের কাটাছেড়া করলে।

১২।   সঠিক ব্যাংক/ শাখায় উপস্থাপন করা না হলে।

১৩।   চেকে জাল এনডোর্সমেন্ট প্রদান করলে।

১৪।   চেক প্রদানকারী/ গ্রাহকের নিকট হইতে চেক অনারের নির্দেশ পাওয়া না গেলে।

১৫।   পূর্বে পেমেন্টকৃত চেক পুনরায় উপস্থাপন করা হইলে।

১৬।  চেক গ্রহীতা সঠিক না হইলে।

১৭।   হাই ভ্যালুড চেক নির্ধারিত শাখায় জমা প্রদান না করলে।

১৮।   চেক ছেড়া হলে।

১৯।   চেক প্রদানকারী কর্তৃৃক চেক হোল্ড করে রাখলে।

২০।   চেক একটিভেট করা না থাকলে।

২২।   গ্রাহকের ক্রেডিট লিমিট অতিক্রম করলে।

২৩।  ট্রান্সজেকশন প্রোফাইল (টিপি) অতিক্রম করলে।

২৪।   চেকে উল্লিখিত ডাটা এবং এমআইসিআর ডাটার মধ্যে অমিল থাকলে।

২৫।  চেক গ্রহীতা কিংবা তাহার অনুমোদিত অন্য বাহক জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে ব্যার্থ হলেও চেক ডিজঅনার হতে পারে।

চেক ডিজঅনার নিয়ে আমাদের ইউটিউব ভিডিও।

চেক ডিজঅনার হলে করনীয়ঃ

কোন চেক ডিজঅনার হলে অবশ্যই প্রথমত চেক ডিজঅনার স্লিপ/ চেক ফেরত স্বারক ব্যাংক কর্তৃপক্ষ হতে গ্রহন করতে হবে এবং তা নিজ হেফাজতে রাখতে হবে। অতপর চেক প্রদানকারী ব্যাক্তিকে দ্রুত অবগত করতে হবে। এবং তাহাকে জানাতে হবে কি কারনে চেক ডিজঅনার হয়েছে। অতপর যদি চেক প্রদানকারী ব্যাক্তি আরও সময় চান তাহা হইলে অবশ্যই চেকের তারিখের প্রতি খেয়াল রেখে সময় দেওয়া উচিত। কারন একটি চেক, চেকে প্রদানকৃত তারিখ হতে ০৬ মাস পর্যন্ত মেয়াদ থাকে। সুতরাং সময় দিতে দিতে যেন চেকটি অকার্যকর হয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অন্যথায় আপনি চেক ডিজঅনারের মামলা/ নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস এ্যাক্ট ১৩৮ ধারা মোতাবেক মামলা দায়েরের যোগ্যতা হারাবেন।

আর যদি চেক প্রদানকারী ব্যাক্তির কথাবার্তায় আপনি অসন্তুষ্ট হন কিংবা উপলব্ধি করেন যে, তিনি আপনাকে আপনার পাওনা টাকা না দিয়া আপনার সহিত প্রতারনা ও তালবাহানা করিতেছে ও তিনি আপনার টাকা দিবেন না তখন আপনি অনতিবিলম্বে একজন আইনজীবির সরনাপন্ন হউন এবং তাহার কথামত চেক ডিজঅনারের মামলা দায়েরের আইনগত পদক্ষেপ গ্রহন করুন।

চেক ডিজঅনারের মামলা দায়েরে করনীয়ঃ

চেক ডিজঅনার হলে আপনাকে প্রথমত একজন আইনজীবির সরনাপন্ন হতে হবে। বিজ্ঞ আইনজীবি আপনার নিকট হতে চেক, ডিজঅনার স্লিপ, আপনার নাম ও পূর্ন ঠিকানা, চেক প্রদানকারীর/ আসামীর পূর্ন নাম ও ঠিকানা, কি মর্মে টাকা পাবেন, টাকা পাওনা তথা উক্ত টাকায় আপনার সত্ব/ মালিকানার যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করবেন। এবং চেক ডিজঅনার হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে আসামী বরাবর রেজিষ্ট্রিকৃত ডাকযোগে লিগ্যাল নোটিশ প্রেরন করবেন। উক্ত নোটিশে আপনি হবেন নোটিশ দাতা এবং চেক প্রদানকারী/ আসামী হবেন নোটিশ গ্রহীতা। এবং উক্ত লিগ্যাল নোটিশে, লিগ্যাল নোটিশ প্রেরনের তারিখ হইতে ৩০ দিন সময় প্রদান করে চেকে উল্লিখিত আপনার পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য নোটিশগ্রহীতা/ আসামীকে নির্দেশ প্রদান করবেন এবং উক্ত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে তাহার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে মামলা দায়ের করা হইবে মর্মে উল্ল্যেখ করবেন।

অতপর উক্ত ৩০ দিনের মধ্যে নোটিশগ্রহীতা/ চেক প্রদানকারী ব্যাক্তি টাকা পরিশোধ না করলে উক্ত ৩০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বিজ্ঞ মুখ্য হাকিম আদালতে নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস এ্যাক্ট এর ১৩৮ ধারা মোতাবেক সি. আর. মামলা দায়ের করতে হবে।

অতপর বিজ্ঞ আদালত প্রথমত আসামীকে নোটিশ প্রদান করবেন। এবং নোটিশে বিজ্ঞ আদালতে হাজির না হলে গ্রেফতারী পরোয়ানা ইস্যু করবেন। তথাপিও যদি আসামী বিজ্ঞ আদালতে হাজির না হউন তাহা হইলে তাহার বিরুদ্ধে হুলিয়া ও তাহার সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরন/ ক্রোক আদেশ প্রদান করিবেন। উহাতেও তাহাকে পাওনা না গেলে ২টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রদান পূর্বক মামলার মুল বিচারিক কার্যক্রম শুরু করবেন।

আর যদি আসামী যথাসময়ে বিজ্ঞ আদালতে হাজির হন ও জামিন লাভ করেন তাহা হইলে আদালত অন্যন্য কার্যক্রম গ্রহন ব্যাতিরেকেই মামলাটির মুল বিচারকার্য শুরু করবেন।

অতপর বাদীকে বিজ্ঞ আদালতে তাহার মুল চেক, ডিজঅনার, লিগ্যাল নোটিশ, ডাক রশিদ, প্রাপ্তি স্বীকারপত্র (যদি থাকে), তাহার টাকা পাওয়ার/ সত্বের/ মালিকানার প্রমানাদি সহ বিজ্ঞ আদালতে স্বাক্ষী প্রদান করে প্রমান করতে হবে যে, তিনি আসামীর নিকট টাকা পান। এবং আসামী উক্ত টাকা পরিশোধের নিমিত্তে চেকটি প্রদান করেছেন চেকটি ডিজঅনার হয়েছে এবং বাদী যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ গ্রহন করে মামলা দায়ের করেছেন। অতপর বিজ্ঞ আদালত যদি বাদীর বক্তব্যে সন্তুষ্ট হন তাহা হইলে বাদীর অনুকুলে আসামীর বিরুদ্ধে মামলার রায় প্রদান করবেন।

চেক ডিজঅনারের শাস্তিঃ

যদি বাদী তাহার মামলা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমান করতে সক্ষম হউন তাহা হইলে বিজ্ঞ আদালত আসামীর বিরুদ্ধে দি নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস এ্যাক্ট ১৮৮১ এর ১৩৮ ধারা মোতাবেক সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের কারাদন্ড প্রদান করবেন ও চেকের সমপরিমান টাকা হতে তিনগুন পর্যন্ত জরিমানার আদেশ প্রদান করবেন। এবং আসামীর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা ইস্যু করবেন।

আসামী কর্তৃক আপীল দায়েরঃ

বাদীপক্ষের উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে আসামীকে আপীল করতে হলে তাহাকে অবশ্যই চেকে বর্নিত পরিমান টাকার ৫০% টাকা আদালতের হিসেবে জমা প্রদান করে জামিন লাভ করতে হবে। এবং কাগজাদি সংগ্রহ পূর্বক উচ্চ আদালতে আপীল দায়ের করতে হবে।

অতপর, উক্ত বিধি মোতাবেক আপনি আপনার পাওনা টাকা উত্তোলন এবং চেক ডিজঅনারের প্রতিকার পেতে পারেন। তবে, এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনাকে একজন ভাল জ্ঞানী আইনজীবি এবং চেক ডিজঅনারের মামলায় পারদর্শী আইনজীবির সরনাপন্ন হতে হবে। অন্যথায় শুধুমাত্র বাজ্যিকতা বিবেচনায় আইনজীবি নিয়োগ করলে একটু ভুলে আপনি আপনার কাঙ্খিত ফলাফল/ রায় হতে বঞ্চিত হবেন। যে ভুল শুধরানোর সুযোগ নেই বললেই চলে।

আইনের আশ্রয় আইনি আলোচনায় সর্বদা আছে আপনাদের পাশে।

আমাদের আয়োজনগুলি ভাল লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন। আপনার মতামত ও কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করে জানাবেন।

চেক ডিজঅনার বিষয়ে আরও জানতে আমাদের আইনের আশ্রয় চ্যানেলটি সাবসক্রাইব করুন ও আমাদের ওয়েবসাইটে চোখ রাখুন অথবা আমাদের ফেসবুক পেজ আইনের আশ্রয়ের সাথেই থাকুন। সবাইকে ধন্যবাদ।

Law Article

কিভাবে ব্যাক্তিগত মোটরসাইকেল নিয়ে বিদেশ ভ্রমন করা যায়।

কিভাবে ব্যাক্তিগত মোটরসাইকেল নিয়ে বিদেশ ভ্রমন করা যায়।

মানুষ সবসময়ই ভ্রমনপ্রিয়। আর এই ভ্রমনের গন্ডি একসময় নিজ দেশ পেরিয়ে বিসৃত হয় বহিঃবিশ্বে। মানুষ তখন বুদ হয় বিদেশ ভ্রমনে। আর এই বিদেশ ভ্রমন যদি

আরও পড়ুন...
পারিবারিক নারী নির্যাতনে কি কি মামলা করা যায়

পারিবারিক নারী নির্যাতন এ কি কি মামলা করা যায়

পারিবারিক নারী নির্যাতনের ঘটনা আমাদের সমাজে প্রতিদিন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী/২০০৩) সহ আরোও অন্যন্য আইনে নারী নির্যাতনের

আরও পড়ুন...
মিথ্যা মামলা করার শাস্তি

বিভিন্ন আইনে মিথ্যা মামলা করার শাস্তি

আইনের জন্মই অপরাধ দমন ও নিরোধ করা ও অপরাধীদের শাস্তির মাধ্যমে তা কার্যকর করা। কিন্তু এই আইনের মাধ্যমেই কেউ যদি কাউকে মিথ্যাভাবে শাস্তি ভোগ করাতে

আরও পড়ুন...
BJS (বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস) এর সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষার সিলেবাস

BJS (বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস) এর সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষার সিলেবাস

BJS (বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস) এর সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষার সিলেবাস সম্পর্কে জানা একজন পরীক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয়। আমাদের আজকের আয়োজনে থাকছে সহকারী জজ নিয়োগের

আরও পড়ুন...